বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণে সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা সংস্কারের লক্ষ্যে আট দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে সরকারের নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডভুক্ত গণকর্মচারী সমন্বয়ে গঠিত বৈষম্যবিরোধী গণকর্মচারী পরিষদ। গতকাল শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। স্বাধীন নিউজ ডটনেটের পাঠকদের জন্য বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণে সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা সংস্কারের প্রস্তাবনা হুবহু প্রকাশ করা হলো।
১.০ পটভূমি
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয় সাবেক সিএসপি, ইপিসিএস ও অন্যান্য সার্ভিসের কর্মকর্তাদের নিয়ে। আজকের যে আমলাতন্ত্র তা অনেক পরিবর্তন, সংযোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে একটা রূপ পরিগ্রহ করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর দ্বিতীয় ভাগের অনুচ্ছেদ ১৯-এ ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অংশে সুযোগের সমতার কথা বলা হয়েছে। সরকারি কর্মের শ্রেণিবিভাগ এতদিন গেজেটেড ও নন-গেজেটেড অভিধায় বিভক্ত থাকলেও অন্যায্যভাবে ‘নন-ক্যাডার’ নামে বিভাজন সৃষ্টি করে সকল প্রশাসনিক সুযোগ সুবিধা এবং ক্ষমতায়ন কাঠামো হতে একটি বিশাল দক্ষ ও মেধাবী সরকারি জনবলকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করা হয়েছে। এটি অনস্বীকার্য যে, সরকারি জনবল কাঠামোয় সব সার্ভিসই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন দপ্তরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা কর্মচারীরাই মূলত সাধারণ জনগণ ও সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি সেবা প্রদানের সাথে যুক্ত। তাই জনপ্রশাসনকে সংস্কার করে প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমুখী করার জন্য ও সেবামান উন্নয়নের জন্য একদিকে যেমন সকল সার্ভিসের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা দরকার, অপরদিকে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নির্বিশেষে বিভিন্ন সার্ভিসের মধ্যে যে ভয়াবহ মৌলিক বৈষম্য বিরাজ করছে, তারও আশু নিরসন জরুরি।
জনপ্রশাসনে যুগোপযোগী সংস্কারসাধনে ও বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যেই সাবেক সচিব জনাব আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীকে প্রধান করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। উক্ত কমিশনে বিভিন্ন সরকারি সার্ভিসের প্রতিনিধিত্বকারী অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বিশালসংখ্যক নন-ক্যাডার কর্মকর্তাবৃন্দের কোনরূপ প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। অবশ্য কমিশন এরই মধ্যে ওয়েবসাইটে নাগরিকদের কাছে প্রশ্নমালা দিয়ে জনপ্রশাসনের কি কি জায়গায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন সে বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করছে। এর বাইরেও বিভিন্ন অংশীজন, জনপ্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের সাথেও বৈঠক করেছে। তবে সরকারি জনবল কাঠামোর অন্যতম বৃহৎ অংশটি অর্থাৎ নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী কোন ফোরাম বা গোষ্ঠীর সাথে অদ্যাবধি কোন বৈঠক বা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি।
এ প্রেক্ষাপটে, সকল দপ্তরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের তাঁদের স্ব স্ব পেশাভিত্তিক উন্নয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যাশা ও প্রস্তাবনাসমূহ জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ও সরকারের সকল নীতিনির্ধারণী মহলের সদয় অবগতির জন্য জরুরি উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
2.0 সরকারি দপ্তরগুলোতে বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য ও বৈষম্য
(ক) পরিচিতি ও মর্যাদাগত বৈষম্য: চাকুরি জীবনের শুরুতেই একই গ্রেডের একজনকে ক্যাডার এবং অপরজনকে নন-ক্যাডার তকমা দেয়া হয়, যা চরম বৈষম্যমূলক। কারণ, ’গেজেটেড অফিসার্স রিক্রটমেন্ট রুলস ১৯৭৮’ এবং ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন (কনসালটেশন) ১৯৭৯’ – এ সরকারি পদগুলোকে ‘গেজেটেড’ এবং ‘নন-গেজেটেড’ এই দুইটি গুচ্ছে বিভক্ত করা হয়, যেখানে নবম গ্রেডকে ‘গেজেটেড’ পদের প্রারম্ভিক পদ এবং ১০ম-২০তম গ্রেডকে ‘নন-গেজেটেড’ পদ হিসেবে রাখা হয়। নন-ক্যাডার পরিচয়টাকে আরও গুরুত্বহীন করতে পরবর্তীতে ‘নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা -২০২৩’ এ ৯ম, ১০ম, ১১তম এবং ১২তম গ্রেডকে নন-ক্যাডার হিসেবে অভিহিত করা হয় যা অনভিপ্রেত। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এরুপ অযৌক্তিক পরিচিতিগত বিভাজনের কারণে একই গ্রেডের সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও সরকারি সুযোগপ্রাপ্তি ও মর্যাদায় ব্যাপক বৈষম্য দেখা যায়। তাই, সরকারি কর্মে ক্যাডার, নন-ক্যাডার প্রভৃতি অভিধার বিলুপ্তির মাধ্যমেই এই বৈষম্যের অবসান ঘটতে পারে।
(খ) প্রেষণ ও পদোন্নতিজনিত বৈষম্য: নন-ক্যাডার কর্মকর্তাবৃন্দ যেসকল ডিপার্টমেন্টে রয়েছেন সেখানে পদসংখ্যা সীমিত। সে কারণে পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। সেখানে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে প্রেষণ পদ্ধতির মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাবৃন্দ পদায়িত হন। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন অধিদপ্তরের দক্ষ নন-ক্যাডার কর্মচারীগণ পদোন্নতি বঞ্চিত হন। যা একজন দক্ষ সরকারি কর্মচারীর পেশাগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের সর্বোপরি কর্মস্পৃহায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরে পদোন্নতি পদের অপ্রতুলতা থাকায় অনেক যোগ্য কর্মচারী পদোন্নতি বঞ্চিত হলেও গুটিকয়েক সার্ভিসে পদ না থাকা সত্ত্বেও সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। এই ধরনের বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য একটি স্বচ্ছতা, সমতা এবং মেধা-ভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি, যাতে সকল সরকারি কর্মচারীগণ তাদের কর্মদক্ষতা অনুযায়ী সমান সুযোগ পান।
(গ) জনবল সৃজন ও ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য: সরকারি সেবার কলেবর গত কয়েক দশকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও জনবলের আকার ও পরিসর সে তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অনেক দপ্তরের নিয়মিত সেবা কার্যক্রমও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা দুরুহ হয়ে পড়েছে। উপরন্তু প্রায় সকল দপ্তরেই পদোন্নতি পদের সংখ্যা এতই অপ্রতুল যে, অনেক সরকারি কর্মচারীকে যোগদানকালীন পদ হতেই সারাজীবন চাকরি করে অবসরে যেতে হচ্ছে। এতে নবীন ও মেধাবী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কর্মস্পৃহা হ্রাস পাচ্ছে যা দীর্ঘমেয়াদে একটি দপ্তরের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, অনেক জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে জনবল সৃজনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা থাকলেও পদ সৃজিত হচ্ছে না বা সকল সরকারি দপ্তরের জনবল সৃজনের প্রয়োজনীয়তাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। সকল সরকারি দপ্তরের জনবল কাঠামো পর্যালোচনা, সম্প্রসারণসহ যাবতীয় কার্যাবলি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে সম্পাদনের জন্য একটি স্বাধীন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা কমিশন’ নামে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের বিকল্প নেই।
(ঘ) আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য: বঞ্চিত দপ্তরসমূহের কর্মচারীরা আর্থিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হন, যা তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব বৈষম্য মূলত বেতন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে ঘটে। একজন সরকারি কর্মচারী যদি বছরের পর বছর ধরে একই পদে এবং একই স্কেলে চাকুরী জীবন অতিবাহিত করেন তাহলে তিনি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় প্রায়শই দেখা যায় যে, বেতনস্কেলের সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছানোর কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীই বছরের পর বছর ন্যায্য ইনক্রিমেণ্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণেই একজন কর্মচারীর পদোন্নতি ও বেতনস্কেল বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য সমতাভিত্তিক বেতন কাঠামো, ভাতা, এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদান নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে সকল কর্মচারীগণ তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। তাই চাকুরির নির্দিষ্ট সময়কাল পূর্তিতে পরবর্তী গ্রেডের পরিবর্তে পদোন্নতি পদের গ্রেড প্রদান-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে এই পুঞ্জীভূত ও জটিল সমস্যার সিংহভাগ নিরসন করা সম্ভব।
(ঙ) শিক্ষা-প্রশিক্ষণে বৈষম্য: প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ লাভের পর প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্তি একজন কর্মকর্তার প্রথম এবং প্রধান অধিকার। কিন্তু দেখা যায় যে, বৈদেশিক মাস্টার্স/পিএইচডি এর ক্ষেত্রে সুযোগগুলো প্রায়ই শুধু ক্যাডার সার্ভিস এর মধ্যে সীমিত রাখা হয়। তাই বিদ্যমান সকল উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য কারিগরি সহায়তা চুক্তিতে (JDS, Australia Awards ইত্যাদি) বিদ্যমান শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগগুলো ক্যাডার, নন-ক্যাডার নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। মূলত একটা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমেই এ বৈষম্য দূর করা সম্ভব।
(চ) নীতি নির্ধারণ ও কর্মসম্পাদনে বৈষম্য: সরকারি কর্মে যারা সরাসরি জনসেবার কাজে নিয়োজিত তাদের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ খুব কমই থাকে। জনসেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সর্বদাই মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের মতামতকে উপেক্ষা করে অথবা আংশিক মতামত গ্রহণ করে প্রণয়ন করা হয়। এক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীগণ কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম জটিলতা ও সমস্যার সম্মুখীন হন। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকল নন-ক্যাডার কর্মচারীকে স্ব স্ব সেবায় প্রশাসনিকভাবে আরও ক্ষমতায়িত করা প্রয়োজন।
(ছ) লজিস্টিকসজনিত বৈষম্যঃ বিভিন্ন দপ্তরসমূহের নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা সরকারি যানবাহন প্রাপ্তি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হন। অথচ কিছু সার্ভিসে কর্মকর্তাগণ সরকারি যানবাহন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান। ব্যক্তিগত গাড়ী ক্রয়ে কিছু ক্যাডার/সার্ভিসের পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য সুদমুক্ত ৩০ লক্ষ টাকা ঋণ প্রদান, মাসিক ৫০,০০০ টাকা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রাপ্তি তারই উদাহরণ। অন্য কোন দপ্তরের সমগ্রেডের কর্মচারীর জন্য এরূপ সুবিধা নেই। এই বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য সরকারি যানবাহন প্রাপ্তি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ এবং সমতাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
এরূপ বৈষম্যের ফলে একটি অস্থির গণকর্মচারী ব্যবস্থাপনাই শুধু গড়ে উঠেনা বরং একটি ভারসাম্যহীন ও পক্ষপাতমূলক সমাজ তথা রাষ্ট্র গড়ে উঠে। এহেন বৈষম্য একটি একটা দক্ষ, জনবান্ধব, বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা বিনির্মাণের প্রধান অন্তরায়।
৩.০ অসমতা, অসামঞ্জস্যতা ও বৈষম্যের প্রভাব ও ফলাফল
(ক) কর্মীদের মনোবল হ্রাস: বঞ্চিত এসকল কর্মচারীগণ যখন প্রতিনিয়ত বৈষম্য এবং অসমতা দেখেন, তখন তাদের মনোবল কমে যায়। কাজের প্রতি উৎসাহ কমে যাওয়ায় কর্মচারীদের সেবা প্রদানে গতি ও আগ্রহ হ্রাস পায়, যা সামগ্রিকভাবে কর্মসম্পাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
(খ) অবিচার ও অসন্তোষবোধ: কর্মচারীগণ যখন নিজেদের বঞ্চিত এবং অবিচারের শিকার মনে করেন, তখন কর্মস্থলে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। তারা নিজেদের পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি, ভাতা, এবং অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে অবহেলিত মনে করেন। এই অসন্তোষ কর্মস্থলের কর্মপরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে এবং দলগত কাজের ক্ষেত্রে বিভাজন সৃষ্টি করে।
(গ) কর্মদক্ষতার অবনতি: বৈষম্যের শিকার কর্মচারীরা তাদের পূর্ণ দক্ষতা ব্যবহার করতে চান না ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠান তার নির্ধারিত লক্ষ্য ও মান অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। উপরন্তু মেধার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় কর্মক্ষমতাও কমে যায়।
(ঘ) দক্ষতা ও মেধার অপচয়: বৈষম্যের কারণে অধিকাংশ কর্মচারীগণ প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এতে তাদের দক্ষতা সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয় না, যার ফলে মেধার অপচয় ঘটে। এই ধরনের অবস্থা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা এবং ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
(ঙ) মানসিক চাপ ও কর্মক্ষেত্রে হতাশা: কর্মচারীগণ বৈষম্যের কারণে ক্রমাগত মানসিক চাপে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে হতাশা এবং মানসিক চাপের কারণে কর্মচারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের পেশাগত কর্মক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
(চ) পেশাদারিত্বের অভাব সৃষ্টি: বৈষম্যের শিকার কর্মচারীরা নিজেদের কাজ এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, যা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। বৈষম্যের শিকার দপ্তরসমূহে এই ধরনের বৈষম্য ও অসামঞ্জস্যতা দূর করতে বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও বিভিন্ন সরকারি সুযোগ প্রাপ্তির বিষয়ে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করলে কর্মচারীরা উৎসাহিত হবেন এবং কর্মস্থলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
৪.০ বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণে সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা সংস্কারের প্রস্তাবনা
প্রস্তাব-১: – রাষ্ট্রের বেসামরিক সকল সরকারি কর্মচারীর (১-২০তম গ্রেড পর্যন্ত) পরিচিতি ও সরকারি সুযোগ প্রাপ্তির মানদণ্ড হবে গ্রেডভিত্তিক। এলক্ষ্যে ‘ক্যাডার’ এবং ‘নন-ক্যাডার’ নামক বৈষম্যমূলক অভিধা বিলুপ্ত করে সেবার ধরণ অনুযায়ী ‘গুচ্ছ সার্ভিস’ পদ্ধতি চালু করতে হবে ।
প্রস্তাব-2: – ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতির পরিবর্তে সার্ভিসভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত এবং বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংস্থায় প্রেষণ বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ রহিত করে স্ব-স্ব দপ্তরের কর্মকর্তাগণের মধ্যে হতে মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
প্রস্তাব-3: – ‘সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা কমিশন’ নামে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে। এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি সকল সার্ভিসের জন্য ন্যায্যতার ভিত্তিতে পদ সৃজন, পদ উন্নীতকরণ, সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন এবং যৌক্তিকীকরণের স্বাধীন দায়িত্ব পালনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত থাকবে।
প্রস্তাব-4: – স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করতে হবে ও নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর কমিশন কর্তৃক নতুন পে-স্কেল ঘোষণা, পে-স্কেলের ধাপসমূহ হ্রাস বা যৌক্তিকীকরণ ও প্রতিবছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি মুল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করতে হবে।
প্রস্তাব-5: – ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাগণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে পদোন্নতি না পেলে জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ এ ১৩ (১) এ বর্ণিত পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির শর্তাবলী অনুযায়ী চাকুরির ৫ বছর পূর্তিতে ৬ষ্ঠ গ্রেড, ১০ বছর পূর্তিতে ৫ম গ্রেড ও ১৪ বছর পূর্তিতে ৩য় গ্রেডের বেতনস্কেল প্রদান করতে হবে।
প্রস্তাব-6: – দেশে ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা, মৌলিক ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ সরকারি সকল সার্ভিসের জন্য মেধা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তার নিরিখে উন্মুক্ত রাখতে হবে।
প্রস্তাব-7: – ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পদের সকল সার্ভিসের কর্মকর্তাগণকে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে ও জনসেবা প্রদানে অধিকতর প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে।
প্রস্তাব-8: – ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পদের সকল সার্ভিসের কর্মকর্তার জন্য প্রয়োজনীয়তার নিরিখে সকল সার্ভিস লজিস্টিকস নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, দীর্ঘদিন ধরে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ সকল পুঞ্জীভূত পেশাগত বৈষম্য এবং অসামঞ্জস্য সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং পরবর্তী ক্যারিয়ার বিকাশের সুযোগ সীমিত, যার ফলে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তারা যথাযথ পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি একই গ্রেডের কর্মকর্তাদের মধ্যে আর্থিক সুবিধায় বড় বৈষম্যও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি, সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং মেধাবীদের জন্য পেশাগত উন্নয়নমূলক সুযোগগুলোও মূলত ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া, নীতি নির্ধারণ ও কর্মসম্পাদন প্রক্রিয়ায় নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই, ফলে তারা প্রায়ই তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। এই বৈষম্য কর্মকর্তাদের মধ্যে বঞ্চনাবোধের জন্ম দেয় এবং কর্মদক্ষতার অবনতি ঘটায়। ফলে, মেধা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার কারণে সরকারি সেবা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই পরিচিতি, পদোন্নতি, জনবল সৃজন, আর্থিক সুবিধা, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, কর্মসম্পাদন এবং লজিস্টিকসের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন সরকারি দপ্তরগুলোর জনসেবা কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নে অপরিহার্য।
এ ধরনের বৈষম্যগুলো দূর করতে সকল সরকারি কর্মচারীর পরিচিতি এবং সুযোগ-সুবিধা গ্রেডভিত্তিক করতে হবে এবং ক্যাডার-নন-ক্যাডার বিভাজন তুলে দিতে হবে। পাশাপাশি, সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতি ও পদায়ন মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে করা উচিত। একটি স্বাধীন এবং শক্তিশালী ‘সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা কমিশন’ গঠনের মাধ্যমে সকল সরকারি সেবার জন্য যথাযথ পদ সৃজন, পদোন্নতি এবং জনবল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও, সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করা জরুরি, যা নিয়মিতভাবে বেতন কাঠামো সমন্বয় করবে এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। সর্বোপরি, সকল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের পেশাগত উন্নয়নের সকল সুযোগ উন্মুক্ত রাখতে হবে, যেন সকল কর্মচারী তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী জনস্বার্থে সেবা প্রদান করতে পারেন।
Reporter Name 









